বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও ফারায়েজ বন্টন পদ্ধতি
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ হলো ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি তার জীবিত ওয়ারিশদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অংশে বন্টন করার বিধান। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬১) এবং পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার নির্দেশনা আলোকে এই সম্পত্তি বন্টন করা হয়। আমাদের এই উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই জমির হিস্যা এবং সম্পদের সঠিক ভাগ বের করতে পারবেন।
ফারায়েজ এর প্রাথমিক শর্তাবলী
সম্পদ বন্টনের পূর্বে মৃত ব্যক্তির কিছু দায়-দায়িত্ব পূরণ করা আবশ্যক:
- কাফন ও দাফনের খরচ মেটানো।
- মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা।
- কোনো ওসিয়ত করে গেলে তা (সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে) পূরণ করা।
এরপর অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করা হয়।
বিস্তারিত উত্তরাধিকার নিয়মাবলী (যাবিল ফুরুজ)
পবিত্র কুরআনে মোট ১২ জন নির্দিষ্ট অংশীদার (যাবিল ফুরুজ) এর কথা উল্লেখ আছে। তাদের অংশ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. স্বামী (Husband)
- ১/৪ অংশ: যদি মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে।
- ১/২ অংশ: যদি মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান বা অধস্তন কোনো বংশধর না থাকে।
২. স্ত্রী (Wife)
- ১/৮ অংশ: যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে।
- ১/৪ অংশ: যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তান না থাকে।
- (নোট: একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।)
৩. কন্যা (Daughter)
- ১/২ অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির একজন মাত্র কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে।
- ২/৩ অংশ: যদি দুই বা ততোধিক কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে।
- আসাবা: যদি পুত্র থাকে, তবে কন্যারা পুত্রের সাথে ২:১ অনুপাতে আসাবা হিসেবে সম্পত্তি পাবে।
৪. পিতা (Father)
- ১/৬ অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র বা পুত্রের পুত্র (অধস্তন পুরুষ বংশধর) থাকে।
- ১/৬ অংশ + আসাবা: যদি মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা থাকে (পুত্র নেই), তবে পিতা ১/৬ অংশ পাবেন এবং কন্যাদের দেয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তিও পাবেন।
- শুধু আসাবা: যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে, তবে পিতা আসাবা হিসেবে সব বা অবশিষ্ট সম্পত্তি পাবেন।
৫. মাতা (Mother)
- ১/৬ অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে অথবা দুই বা ততোধিক ভাই-বোন থাকে।
- ১/৩ অংশ: যদি সন্তান না থাকে এবং ভাই-বোন ১ জনের বেশি না থাকে।
- ১/৩ (অবশিষ্টের): যদি স্বামী/স্ত্রী এবং পিতা থাকে (উমারিয়্যাত কেস), তবে স্বামী/স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর বাকি সম্পত্তির ১/৩ অংশ মাতা পাবেন।
৬. ভাই-বোনের অংশ ও শর্তাবলী (Siblings)
ভাই-বোনেরা তিন ধরনের হতে পারে: আপন (Full), বৈমাত্রেয় (Consanguine) এবং বৈপিত্রেয় (Uterine)। তাদের উত্তরাধিকার কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করে:
- আপন ভাই (Full Brother): যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র বা পিতা জীবিত না থাকে, তবে আপন ভাইরা 'আসাবা' হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তি পায়। আপন বোন থাকলে ২:১ অনুপাতে ভাগ করে নেয়।
- আপন বোন (Full Sister): যদি ভাই, পুত্র বা পিতা না থাকে, তবে ১ জন বোন ১/২ অংশ এবং একাধিক বোন ২/৩ অংশ পায়।
- বৈপিত্রেয় ভাই/বোন (Uterine Brother/Sister): যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা পিতা-দাদা না থাকে (কালালা অবস্থা), তবে ১ জন বৈপিত্রেয় ভাই/বোন ১/৬ অংশ এবং একাধিক থাকলে ১/৩ অংশ সমানভাবে ভাগ করে পায়।
- বঞ্চনা (Exclusion): পিতা বা পুত্র জীবিত থাকলে ভাই-বোনেরা সাধারণত কোনো সম্পত্তি পায় না।
উত্তরাধিকারীদের শ্রেণীবিভাগ (হানাফি মাযহাব)
জটিলতা ও সমাধান (আউল ও রদ)
কখনও কখনও মোট অংশ ১-এর বেশি বা কম হতে পারে। সেক্ষেত্রে দুটি বিশেষ নীতি প্রয়োগ করা হয়:
- আউল (Awl): যখন ওয়ারিশদের মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন আনুপাতিক হারে সবার অংশ কমিয়ে ১-এর মধ্যে আনা হয়।
- রদ (Radd): যখন নির্দিষ্ট অংশ দেয়ার পর কিছু সম্পত্তি বাকি থাকে কিন্তু কোনো আসাবা নেই, তখন সেই বাকি সম্পত্তি পুনরায় নির্দিষ্ট অংশীদারদের (স্বামী-স্ত্রী বাদে) মধ্যে বন্টন করা হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
স্ত্রী কখন ১/৪ এবং কখন ১/৮ অংশ পান?
মৃত স্বামীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ। আর যদি কোনো সন্তান না থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন ১/৪ অংশ।
মেয়েরা কি বাবার সম্পত্তির সমান ভাগ পায়?
ইসলামী আইনে সাধারণত ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায় (২:১ অনুপাতে)। তবে কোনো ছেলে না থাকলে মেয়েরা নির্দিষ্ট অংশ (১/২ বা ২/৩) পায় এবং আসাবা হিসেবে বাকি অংশও পেতে পারে (রদ নীতি অনুযায়ী)।
সৎ ভাই-বোন কি সম্পত্তি পায়?
বৈমাত্রেয়ে (বাবার এক, মা ভিন্ন) এবং বৈপিত্রেয়ে (মায়ের এক, বাবা ভিন্ন) ভাই-বোনেরা নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে সম্পত্তি পেতে পারে। তবে আপন ভাই বা বাবা জীবিত থাকলে তারা বঞ্চিত হতে পারে (হাজব)।
বাবা বেঁচে থাকতে দাদা মারা গেলে নাতি কি সম্পত্তি পাবে?
না, মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে বাবা বেঁচে থাকলে দাদা মারা গেলে নাতি সম্পত্তি পায় না। তবে দাদা চাইলে জীবদ্দশায় নাতিকে সম্পত্তি হেবা (দান) বা ওসিয়ত করে যেতে পারেন (সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ)।
নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টন করা যাবে কি?
ইসলামী আইন ও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে তাকে মৃত ঘোষণা না করা পর্যন্ত তার সম্পত্তি বন্টন করা যায় না। সাধারণত নিখোঁজ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় (যেমন ৪ বছর বা পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন) অপেক্ষা করার পর আদালতের মাধ্যমে মৃত ঘোষণা করা হয়।
গর্ভস্থ সন্তান কি উত্তরাধিকারী হয়?
হ্যাঁ, যদি কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় তার স্ত্রী গর্ভবতী থাকেন, তবে সেই অনাগত সন্তানের জন্য একটা অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়। সন্তান জীবিত জন্মগ্রহণ করলে সে তার লিঙ্গ অনুযায়ী (ছেলে বা মেয়ে) নির্ধারিত অংশ পাবে।
উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনে আসাবা কারা?
আসাবা হলো তারা যারা নির্ধারিত অংশ (যাবিল ফুরুজ) দেয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি পায়। প্রধানত চার শ্রেণীর পুরুষ আত্মীয় আসাবা হন: ১. পুত্র ও তার অধস্তন বংশধর, ২. পিতা ও তার ঊর্ধ্বতন পুরুষ বংশধর, ৩. ভাই ও তাদের পুত্ররা, ৪. চাচা ও তাদের পুত্ররা।